শিরোনাম - কদরশ্রীচরনেষু তুমি কেমন আছো মা?আজ তুমি জিতেছ মা।অবাক হচছ নাকি ভয়ংকর ভয় পাচছ? জানি জেতা বা হারা নিয়ে তোমার কোন তাপ উত্তাপ নেই!তোমার শুধুই চিন্তা প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার। এক কথায় নিজের সব ইচ্ছা অনিচ্ছাকে জলাঞজলী দিয়ে অ্যাডজাষট করা!!! আর আমাকে নিয়েই তোমার ভয় - কারন ভুল কে ভুল বলতে আমার ভয় ডর নেই।কত শিখিয়েছ মেয়েদের কি কি করতে নেই! তবু আমি শিখিনি!! তোমার জয় হয়েছে মা, সে কথা বলব ,আগে তুমি নিজেকে কত ভাবে বঞ্চিত করেছ, কিভাবে সমস্ত ফাই ফরমাশ মেনে সারাদিন বাসন মেজে ,রান্না করে সবার মুখের সামনে খাবার তুলে দিয়ে নিজেকে যন্ত্র বানিয়েছ, নিজেই তুমি নিজেকে কদর করতে ভুলেছ সে কথাই প্রথম বলি।মা ,তোমার স্মৃতি গুলো কেমন এলোমেলো হয়েছে, সব ভুলে যাও তুমি ,ডাক্তার বাবু বলেছেন ঠিক করা খুবই অসম্ভব। আমাদের একান্ন বর্তি পরিবারের সদস্যদের একত্রিত রাখার জন্য কত কত বঞ্চনা ,লাঞ্ছনাকে তুমি মাথা পেতে নিয়েই ,ভুলে যাওয়া অনুশীলন করেছ। আজ এত আদরে থেকেও সব ভুলেছ, অনুশীলনের কত গভীরতা ভাবি! কাক ভোরে ঘুম থেকে উঠে ,উঠোনে গোবর গোলা জল ছিটিয়ে, তুলসী তলা নিকিযে, আগের দিনের বাসী কাপর ছেড়ে স্নান করে তুমি ঢুকতে রান্নাঘরে।কয়লার উনুনে ঘুটে কয়লা পর পর সাজিয়ে নারিকেল গাছের পাতা ধরিয়ে আগুন ওঠার ব্যবস্থা করতে,পেজা তুলোর মত ধোয়া বেরোত ।তুমি ঠিক জানতে ধোয়া শেষে কখন গনগনে আগুন বেরোবে!এর ফাঁকে আমাকে ঘুমের থেকে তুলে, আগের দিনের হাড়ি- কডাই -থালা নিয়ে পুকুরের জলে ডুবিয়ে দিতে,সহজেই পরিষ্কার হবে বলে।সঙ্গে সঙ্গেই এক ঝাঁক ছোট্ট ছোট্ট মাছ সাঁতার দিয়ে ওই বাসন জমা হত আর খুঁটে খুঁটে বাসনে লেগে থাকা খাবার গুলো খেত,তুমি মাঝে মাঝেই বাসন মাজা বন্ধ করে,ওদের আনন্দ উপভোগ করতে উদাস হয়ে, তোমার চোখে এক চিলতে হাসি লেগে থাকত। আমাকে পুকুরের পাড়ে বসিয়ে রাখতে। আমার সব মনে আছে মা।একান্ন বর্তী পরিবারের সদস্যদের তোমার প্রতি অবহেলা, তোমার দুঃখের নিজস্ব মৌনতা আমাকে অনেক ছোট বযসেই সংবেদনশীল করে তোলে। সারাদিন সারাবছর এত বার পুকুরে যাতায়াত করতে হয়েছে যে পুকুরের জল কেই মনে হয় ভেবে নিয়েছ সমুদ্রের জলের রূপে।তাই মনে হয় সমুদ্র সৈকতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করোনি। পুকুর থেকে ফিরে এসে তাল পাতার পাখার বাতাসে গনগনে আগুন আনতে উনুনে।চা ও জলখাবার বানাতে তুমি ।একে একে ঘুম থেকে উঠত সবাই। ঠাকুর মা আগেই উঠতে চাইত, দুই পিসি উঠতে দিত না। ঠাকুর দা তোমায় একটু স্নেহ ই করত, তবে পিসি কাকুদের লুকিয়ে। জলখাবারে কোন ত্রুটি হলে কত কথাই না শোনাতো পিসিরা।সেদিন থেকেই বুঝেছি মেয়েদের শ্রমের কদর করতে দেয়নি মেয়েরা। এ যেন এক কঠিন পরম্পরা, যার সৃষ্টি মেয়েদের দ্বারা। অথচ তোমার কোনও উত্তর ছিল না।কারোর কাছে অভিযোগ করোনি কোনদিন!!দুপুরের রান্নার পর সবার খাবার শেষে তুমি বসতে খাবার নিয়ে কেউ একটুও ভাবত না মা তুমি খেলে কিনা!আমাকে অবশ্য ভালোই বাসত, পাশে নিয়ে শুতো,কখনও কখনও কোলে নিত।তোমার নামে নিন্দা করত আমার কাছে, আমি কারন বুঝতাম না,ওদের কাছে জানতে চাই নি কারন, কোনদিন। একদিন সহ্য করতে না পেরে, তোমার কাছেই জানতে চেয়েছিলাম তোমার কদর হীন হয়ে থাকার কারণ। তুমি বলেছিলে বড়দের কথার মধ্যে ছোটদের থাকতে নেই। ভালো করে পড়াশোনা করে ভালো মনের মানুষ হও। আদর, অনাদর, কদর কখন , কে কাকে করে নিজেই বুঝতে পারবে। তোমার শ্রমের ওপর নির্ভর করে দুই কাকু চাকরী পেল, প্রথম মাসের মাযনা পেয়ে বাসা ভাড়া করে চলে গেল। পিসি দুজনের বিয়ে হল পয়সাওলা ঘরে।তবু ওদের রাগ কমল না ,তোমার ওপর থেকে।বরং অত্যাচার এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত করল অর্থনৈতিক অহংকার, প্রতি বাক্য বানে বুঝিয়ে দিত বাবা ও তোমার আর্থিক দুর্বলতার কারনে আমরা ভাই বোনেরা মানুষ হবার আগেই শেষ হয়ে যাব!বাবা অসুস্থ হল, কর্ম শক্তি হারালো,কেউ একদিন জানতে চাইল না বাবার চিকিৎসার খরচ বহন করছি আমরা কিভাবে!তখন আমার বয়স ঠিক একুশ, সারাদিন ছাত্র পড়াই, বাবার জমানো টাকার সুদ পাই ,তা দিয়েই আমাদের সরল জীবন আর বাবার চিকিৎসা চলে।যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল ওদের সাথে।ঠাকুর মা গত হবার পর ,ঠাকুর দা বিধ্বস্ত,কয়েক মাস পর দাদুও গত হলেন। বিগত বছরের দেওয়া নেওয়ার কথা ওরা ভুললেও আমি ভুলতে পারি নি।আমি তোমার ও বাবার আশীর্বাদে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকার চাকরি পেলাম। ভাই একটা চাকরি পেল।সংসারের শ্রী ফিরল। আমায় সংসারী করলে।আমার বয়স 53 হল,আমার সংসারের বয়স 22 হল।কোথা থেকে আমার ফোন নম্বর জোগাড় করে আমাকে ফোন করে ছোট পিসি।আমাদের সবার খবর নিলো।আমার কথা বলতে মন চাইছিল না।ভদ্রতার কদর কতটা বোঝানোর জন্যই কথা বললাম। বলল কোনও মেয়েই সঠিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় নি।ছোট পিসির ছোট মেয়েটা মানসিক ভাবে অসুস্থ। এক ফাঁকে ঠিক তোমার নিন্দা করতে ছাড়ল না।আমি দৃঢ় অথচ শান্ত গলায় জানালাম -- পিসি ,আমার মা কিন্তু কোনদিন তোমাদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ কারও কাছে এমনকি আমাদের কাছেও করল না।আমার মধ্য 53 বছর বয়সে তোমাকে আর বেশিকিছু বলতে চাই না।কি জানি কি ভাবল, কি ই বা বুঝল আজ আবার ফোন করে ভুল স্বীকার করল,তোমার বেশ কিছু গুনের কথা মনে করালো আমায়। ঘুট ঘুটে অন্ধকার জীবনে চাঁদের আলোয় যে স্বপ্ন বুনতে, তা সফল এখন। রাত টুকু তোমার নিজের ছিল মাকত কবিতা লিখতে অভাবের কেরোসিন আলোয় লুকিয়ে লুকিয়ে। আজ তো তোমার অভাব নেই, হচারিদিকে আলো ।ঈশ্বর তোমাকে জিতিযে দিয়েছে, ভয় করা অভ্যাস ছাড়, স্মৃতিকে আনো জয়ের কবিতা লেখ ,নিজের কদর নিজে করো। ইতিতোমার মেয়ে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ঋতু

অনুপ্রাণন

তুই